বিড়াল পালন কি সত্যিই স্কিজোফ্রেনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়?
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একটি গবেষণাকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। শিরোনামটি ছিল বেশ চমকপ্রদ বিড়াল পালন করলে স্কিজোফ্রেনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই এমন খবর অনেক বিড়ালপ্রেমীকে উদ্বিগ্ন করেছে। কিন্তু গবেষণার মূল ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাস্তবতা শিরোনামের চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং সূক্ষ্ম। ২০২৩ সালে Schizophrenia Bulletin জার্নালে প্রকাশিত একটি সিস্টেম্যাটিক রিভিউ ও মেটা-অ্যানালাইসিসে গত ৪৪ বছরে ১১টি দেশে পরিচালিত ১৭টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, শৈশবে বিড়ালের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে স্কিজোফ্রেনিয়া-সংশ্লিষ্ট মানসিক সমস্যার সঙ্গে একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক (association) রয়েছে। তবে গবেষকরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, এই সম্পর্ক কোনোভাবেই প্রমাণ করে না যে বিড়ালই স্কিজোফ্রেনিয়ার কারণ। সম্পর্ক (association) আর কারণ (causation)—এই দুটি বিষয় এক নয়। গবেষণায় আলোচিত একটি সম্ভাব্য কারণ হলো Toxoplasma gondii নামের একটি অণুজীব। এই পরজীবীর প্রধান আশ্রয়দাতা বিড়াল হলেও এটি শুধু বিড়ালের মাধ্যমেই ছড়ায় না। অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা মাংস, দূষিত পানি, অপরিষ্কার ফল ও সবজি থেকেও মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। অধিকাংশ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণে কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। তবে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষা করে দেখছেন, এই পরজীবী মস্তিষ্কের কার্যক্রম বা আচরণগত পরিবর্তনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে কি না। এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি। গবেষণাটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত অধিকাংশ গবেষণাই ছিল পর্যবেক্ষণমূলক (observational), যা কারণ-ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে না। পাশাপাশি, সব গবেষণার ফলও এক ছিল না। কয়েকটি গবেষণায় বিড়াল পালন ও স্কিজোফ্রেনিয়ার মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য সম্পর্কই পাওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, জিনগত বৈশিষ্ট্য, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক অবস্থা, শৈশবের অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য সংক্রমণের মতো বিষয়গুলোও এই ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাহলে কি বিড়াল পালন বন্ধ করে দেওয়া উচিত? বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, এর কোনো প্রয়োজন নেই। বরং সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই যথেষ্ট। বিড়ালের লিটার পরিষ্কার করার পর ভালোভাবে হাত ধোয়া, বিড়ালকে কাঁচা মাংস না খাওয়ানো, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং গর্ভবতী নারীদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করলে Toxoplasma gondii সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। অন্যদিকে, বহু গবেষণায় দেখা গেছে পোষা প্রাণী মানুষের মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তারা একাকীত্ব কমায়, মানসিক চাপ হ্রাস করে এবং আবেগগত সমর্থন প্রদান করে। তাই একটি গবেষণার চমকপ্রদ শিরোনাম দেখে আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে পুরো গবেষণার প্রেক্ষাপট ও সীমাবদ্ধতা বোঝা জরুরি। বিজ্ঞানের ভাষায়, এই গবেষণা একটি সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছে—কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তাই অযথা ভয় নয়; বরং সচেতনতা, স্বাস্থ্যবিধি এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঠিক ব্যাখ্যাই হওয়া উচিত আমাদের পথনির্দেশক।



