RUSC

মাইক্রোপ্লাস্টিক: একটি নীরব ঘাতক

শতাব্দীর অন্যতম বড় পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য সংকটের নাম মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ। প্লাস্টিক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠলেও এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব পৃথিবীকে এক ভয়াবহ বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখনো পর্যন্ত বিশ্বে উৎপন্ন মোট প্লাস্টিক বর্জ্য এক জায়গায় জড়ো করলে তা পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে যাবে। ১৯৫০ সালে বিশ্বে প্লাস্টিক উৎপাদন ছিল মাত্র ১.৭ মিলিয়ন টন, যা বর্তমানে ৪৬০ মিলিয়ন টনেরও বেশি। উৎপাদিত প্লাস্টিকের মাত্র ৯% পুনর্ব্যবহার করা হয়; বাকি অংশ পরিবেশে জমা হয় বা নদী-সমুদ্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়, যাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। অদৃশ্য এই কণাগুলো আজ পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য এক নতুন হুমকি হয়ে উঠেছে।

প্লাস্টিক আবিষ্কারের ইতিহাস

প্লাস্টিকের ইতিহাস শুরু হয় উনবিংশ শতাব্দীতে। ১৮৬২ সালে Alexander Parkes বিশ্বের প্রথম মানবসৃষ্ট প্লাস্টিক পার্কেসিন (Parkesine) আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে ১৯০৭ সালে Leo Baekeland বেকেলাইট (Bakelite) আবিষ্কার করেন, যা বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ কৃত্রিম প্লাস্টিক হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে সহজলভ্যতা ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণে প্লাস্টিকের জনপ্রিয়তা বাড়লেও এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব থেকেই আজকের সংকটের সূচনা।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিক কণা। সাধারণত এগুলো দুই ধরনের হয়ে থাকে—প্রাথমিক (Primary) এবং দ্বিতীয়িক (Secondary) মাইক্রোপ্লাস্টিক। প্রাথমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক শুরু থেকেই ক্ষুদ্র আকারে উৎপাদিত হয়, যেমন প্রসাধনী পণ্যের মাইক্রোবিড বা শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত প্লাস্টিক পেলেট। অন্যদিকে, দ্বিতীয়িক মাইক্রোপ্লাস্টিক সৃষ্টি হয় বড় প্লাস্টিক বর্জ্য সূর্যের আলো, তাপ, বৃষ্টি, ঢেউ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হলে।বর্তমানে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন যে পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রায় ১৭০ ট্রিলিয়ন প্লাস্টিক কণা ভাসছে, যার অধিকাংশই মাইক্রোপ্লাস্টিক। এগুলো নদী, মাটি, বাতাস, বৃষ্টির পানি এমনকি মানবদেহেও পৌঁছে গেছে।

মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

বিজ্ঞানীরা মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, মস্তিষ্ক, ধমনী এবং গর্ভফুলে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছেন। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় পরীক্ষা করা ৬২টি গর্ভফুলের ১০০% নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। দূষিত পানি, খাদ্য ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এসব কণা শরীরে প্রবেশ করে। এর ফলে কোষের প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। ন্যানোপ্লাস্টিক মস্তিষ্কেও প্রবেশ করতে সক্ষম, যা আরও উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশ ও বিশ্বে মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিস্থিতি

UNEP-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ১১ মিলিয়ন টনেরও বেশি প্লাস্টিক সমুদ্রে প্রবেশ করে। বর্তমানে সমুদ্রে ৭৫–২০০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক জমা রয়েছে। এভারেস্টের তুষার, আর্কটিকের বরফ এবং গভীর সমুদ্রেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৩,০০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। কক্সবাজারে পরিচালিত এক গবেষণায় ১১,৫৫৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে এবং প্রতি বর্গমিটারে গড়ে ৪০৯টি কণা পাওয়া গেছে। বালু, শীতলক্ষ্যা, কর্ণফুলী ও পশুর নদীতেও ব্যাপক দূষণের প্রমাণ মিলেছে।

সচেতনতা ও করণীয়

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানো, পাট বা কাপড়ের ব্যাগের ব্যবহার বাড়ানো,প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং কঠোর সরকারি নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক একটি নীরব ঘাতক, যা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি। পৃথিবীর সমুদ্র থেকে মানবদেহের রক্ত, মস্তিষ্ক ও গর্ভফুল পর্যন্ত এর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে সমস্যাটি আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য এখনই সচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top