
মহাবিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত, অথচ সবচেয়ে রহস্যময় শক্তি কোনটি বলুন তো? আজ থেকে শত শত বছর আগে যদি আপনি গাছ থেকে একটি আপেল মাটিতে পড়তে দেখতেন, তবে সেটাকে খুব সাধারণ একটা ঘটনা বলেই ধরে নিতেন। কিন্তু এই সাধারণ ঘটনার পেছনেই লুকিয়ে ছিল মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষ। আজ আমরা এমন এক রোমাঞ্চকর ব্যাখ্যায় যাব, যেখানে গ্র্যাভিটি নিয়ে মুখোমুখি হবেন বিজ্ঞানের দুই শতাব্দীর দুই মহান বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন এবং আলবার্ট আইনস্টাইন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে একজন ভুল আর একজন সঠিক, কিন্তু গল্পের শেষে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক দারুণ টুইস্ট!
নিউটনের চোখে গ্র্যাভিটি এক অদৃশ্য টান। ১৬৮৭ সালে স্যার আইজ্যাক নিউটন আমাদের জানালেন, গ্র্যাভিটি হলো এক ধরণের অদৃশ্য আকর্ষণ বল।
মূল ধারণা: মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তু (যার ভর আছে) একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বলের মান বস্তু দুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
ভিত্তি: নিউটনের বলবিদ্যার ভিত্তি ছিল একটি স্থির, অপরিবর্তনীয় থ্রি-ডিমেনশনাল (3D) স্পেস বা স্থান। যেখানে সময় সবার জন্য সমানভাবে বয়ে চলে।নিউটন আমাদের গাণিতিকভাবে বুঝিয়ে দিলেন কেন চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, কিংবা কেন পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে। তার সূত্র ধরেই আমরা চাঁদে রকেট পাঠিয়েছি, কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে স্থাপন করেছি।
কিন্তু নিউটনের একটা জায়গায় খটকা রয়েই গেল, এই অদৃশ্য বলটা আসলে কীভাবে? কোনো মাধ্যম ছাড়াই কোটি কোটি মাইল দূর থেকে কাজ করে? নিউটন নিজে এর উত্তর দিতে পারেননি।
১৯১৫ সালে এলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি এসে আমাদের চেনা মহাবিশ্বের ধারণাই বদলে দিলেন। তিনি বললেন, গ্র্যাভিটি আসলে কোনো আকর্ষণ বল-ই না!
মূল ধারণা (সাধারণ আপেক্ষিকতা): আইনস্টাইন স্থান (Space) এবং সময় (Time) কে একসাথে জুড়ে দিয়ে এক নতুন চাদর বুনলেন, যার নাম “স্পেস-টাইম ফ্যাব্রিক” (Space-Time Fabric) বা স্থান-কাল।
ভিত্তি: কোনো ভারী বস্তু (যেমন সূর্য) যখন এই স্পেস-টাইমের চাদরে বসে, তখন চাদরটি জ্যামিতিক উপায়ে বেঁকে বা মুচড়ে যায়। ঠিক যেমন একটা টানটান করা খাটিয়ার ওপর ভারি লোহার বল রাখলে মাঝখানটা দেবে যায়। এখন আপনি যদি ওই দেবে যাওয়া অংশের পাশ দিয়ে একটি ছোট মার্বেল ছেড়ে দেন, তবে সেটি ওই গর্তের চারপাশে ঘুরতে থাকবে। আইনস্টাইনের মতে, সূর্য তার ভরের কারণে স্পেস-টাইমকে বাঁকিয়ে দিয়েছে বলেই পৃথিবী তার চারপাশে ঘুরছে। কোনো অদৃশ্য দড়ি বা আকর্ষণ বল এখানে নেই!
তবে কি তাদের মধ্যে কোনো মিল নেই? (The Core Connection) আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে আইনস্টাইন বোধহয় নিউটনকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করেছেন। কিন্তু টুইস্টটা এখানেই তারা আসলে একে অপরের পরিপূরক! বিজ্ঞানের ভাষায়, আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা হলো নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের একটি অতি উন্নত ও বিস্তৃত রূপ। যখন আমরা আমাদের সাধারণ পৃথিবী, চাঁদ বা দৈনন্দিন জীবনের হিসাব-নিকাশ করি, তখন আইনস্টাইনের জটিল সমীকরণ আর নিউটনের সহজ সমীকরণের ফলাফল একদম হুবহু এক আসে! নিউটনের সূত্র যেখানে আলোর গতির চেয়ে অনেক কম গতির বস্তুর জন্য দারুণ কাজ করে, আইনস্টাইনের সূত্র সেখানে আলোর গতি বা ব্ল্যাকহোলের মতো চরম তীব্র গ্র্যাভিটির ক্ষেত্রে মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করে।
একটি উপমা দিয়ে বিষয়টিকে বোঝানো যাক। ধরা যাক, একটি পুকুরে খেলতে যেয়ে ফুটবল পড়ে গেল। এখন ফুটবলটিকে পাড়ে আনতে পাড়ের বিপরীত দিক হতে ঢেউয়ের সৃষ্টি করা হয়। এখন যদি এই পুকুরের পানির ঢেউকে আমরা স্পেস-টাইমে বক্রতার কারণে সৃষ্ট বাঁকের সাথে তুলনা করি। এই ঢেউয়ের ফলে বলটি যে পাড়ের দিকে নির্দিষ্ট বল অনুভব করে ত্বরণে এগিয়ে যায় তাকে আমরা নিউটনের গ্র্যাভিটির দৃষ্টিকোণের সাথে তুলনা করতে পারি এবং ঐ পুকুর বা পুকুরের ঢেউকে তুলনা করতে পারি আইনস্টানের মতবাদের সাথে।
এবার আসা যাক সেই চূড়ান্ত রহস্যে। নিউটন গ্র্যাভিটিকে বল ভেবেছিলেন, আইনস্টাইন একে বললেন জ্যামিতিক বক্রতা। কিন্তু আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলছে অন্য কথা! কোয়ান্টাম মেকানিক্সের যুগে এসে বিজ্ঞানীরা খুঁজছেন “গ্র্যাভিটন” (Graviton) নামের এক কাল্পনিক কণা, যা নাকি গ্র্যাভিটি আদান-প্রদান করে। যদি গ্র্যাভিটন সত্যি থেকে থাকে, তবে আইনস্টাইনের “স্পেস-টাইম বক্রতা”র ধারণাটি আবার এক নতুন মোড় নেবে। তার মানে, আমরা আজও গ্র্যাভিটির শেষ সত্যটা জানতে পারিনি! মহাকর্ষের এই লুকোচুরি খেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিজ্ঞান কোনো থমকে যাওয়া নদী নয়, এটি একটি অন্তহীন অন্বেষণ।
বিজ্ঞান ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র, যুক্তির আলোয়।
