RUSC

আপনার স্বপ্ন কি শুধুই কল্পনা, নাকি ঘুমের আড়ালে তৈরি হয় অজনা রহস্য?

মস্তিষ্ক ঘুমের সময় সবসময় সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকে না; বরং এটি একটি জটিল স্নায়বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, যার মাধ্যমে এটি অবচেতন মনে একটি সমান্তর বাস্তবতা তৈরি করে। বিজ্ঞান ও নিউরোসায়েন্সের দৃষ্টিকোণ থেকে স্বপ্ন কেবল কল্পনার ফল নয়। বরং এটি এমন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার অংশ, যা মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও স্মৃতি সংগঠনের সাথে জড়িত।

➤REM ঘুম ও স্বপ্নের নিউরোসায়েন্স :

ঘুমের যে পর্যায়টি সবচেয়ে সক্রিয়, তাকে বলা হয় REM (র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট) বা দ্রুত চোখের নড়াচড়াযুক্ত ঘুম। এই পর্যায়ে শরীরের পেশীগুলো সাময়িকভাবে প্যারালাইজড বা অবশ হয়ে যায়—এ অবস্থাকে বলা হয় স্লিপ প্যারালাইসিস, যদিও মস্তিষ্ক তখনও খুব সক্রিয় থাকে, প্রায় জেগে থাকা অবস্থার মতো।

এটি লক্ষণীয় যে, এই পর্যায়ে মস্তিষ্কের যে অংশটি যুক্তি ও বিচারবুদ্ধির জন্য দায়ী—ডরসোল্যাটারাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (DLPFC)—সেটির কার্যকলাপ কমে যায়। অন্যদিকে, আবেগ প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রধান ভূমিকা পালন করা অ্যামিগডালা এবং দৃশ্যমান বস্তুর প্রক্রিয়াজাতকরণে জড়িত ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স খুব সক্রিয় হয়ে ওঠে। যুক্তিচিন্তা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার কারণেই আমাদের স্বপ্নের অদ্ভুত, অবাস্তব ও প্রায়শই অসম্ভব ঘটনাগুলো আমাদের কাছে পুরোপুরি সত্য বলে মনে হয়।

➤আমরা কেন স্বপ্ন দেখি?

আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে, স্বপ্ন মস্তিষ্কের রাতকালীন রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।
প্রতিদিন আমরা হাজার হাজার তথ্য, অভিজ্ঞতা ও আবেগের সম্মুখীন হই। মস্তিষ্ককে সিদ্ধান্ত নিতে হয় কোনগুলো স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি থেকে দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিতে স্থানান্তরিত হবে এবং কোনগুলো বাদ দেওয়া হবে। স্বপ্ন হয়তো এই প্রক্রিয়াজাতকরণেরই একটি দৃশ্যমান রূপ।
চাপ, উদ্বেগ ও দমনকৃত আবেগগুলো স্বপ্নের মাধ্যমে এক ধরনের নিরাপদ মুক্তি পেতে পারে। এই প্রক্রিয়া মস্তিষ্ককে কষ্টদায়ক আবেগময় অভিজ্ঞতা ও মানসিক ট্রমা মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে।
মস্তিষ্ক কখনও কখনও স্বপ্নে বিভিন্ন বিপদ বা পরিস্থিতির সিমুলেশন তৈরি করে। এই সিমুলেশনগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, সম্ভাব্য হুমকি থেকে বেঁচে থাকা বা সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।

➤আমরা কেন স্বপ্ন ভুলে যাই?

ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা আমাদের স্বপ্নের প্রায় ৫০% ভুলে যাই। এর একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো মস্তিষ্কের রাসায়নিক পরিবর্তন। REM ঘুমের সময় নিউরোট্রান্সমিটার নরএপিনেফ্রিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যা স্মৃতি গঠন ও ধরে রাখার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সেই মুহূর্তে মস্তিষ্ক নতুন দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি তৈরি করার চেয়ে বিদ্যমান তথ্য প্রক্রিয়াজাত ও সংগঠিত করতে বেশি ব্যস্ত থাকে বলে মনে হয়।

➤ডেজা ভু :

যখন আমরা কোনো নতুন স্থান বা পরিস্থিতির সম্মুখীন হই এবং সেই মুহূর্তে হঠাৎ অনুভব করি যে আমরা এটি আগেও অভিজ্ঞতা করেছি, তখন একে বলা হয় ডেজা ভু।

বিজ্ঞানীরা ডেজা ভুকে এমন প্রমাণ হিসেবে দেখেন না যে কোনো স্বপ্ন ভবিষ্যৎবাণী করেছে। বরং তাদের মতে, এটি মস্তিষ্কের স্মৃতি-প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার একটি ক্ষণস্থায়ী ত্রুটি বা “মিসফায়ার” হতে পারে। একটি অনুমান হলো, যদি সংবেদনশীল তথ্য অস্বাভাবিকভাবে প্রক্রিয়াজাত হয়, তবে একটি নতুন অভিজ্ঞতিকে ভুলভাবে পরিচিত বা আগেই অভিজ্ঞত হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। তখনই প্রথমবার ঘটছে এমন কিছু হঠাৎ অদ্ভুতভাবে পরিচিত মনে হতে পারে, যেন এটি আগেই ঘটেছে।

লিখেছেন
ইবনাত আমিন রিদিতা
কার্যনির্বাহী সদস্য
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সায়েন্স ক্লাব

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top