RUSC

সুপার এল নিনো: উত্তপ্ত সমুদ্রের রাগ কি পৃথিবীকে পোড়াবে?

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাসাগর প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে বাতাস সাধারণত পশ্চিম দিকে বয়ে চলে। এই বাতাস উষ্ণ পানিকে পশ্চিম দিকে ঠেলে রাখে, আর পূর্বে থাকে ঠান্ডা পানি। কিন্তু কখনো কখনো এই বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন সেই উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। দক্ষিণ আমেরিকার জেলেরা এই ঘটনাটি প্রথম লক্ষ্য করেন।
প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের পানির তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যায়, তখন সেই চরম অবস্থাকে ‘সুপার এল নিনো’ (Super El Niño) বলা হয়। মার্কিন ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৬ সালে এই সুপার এল নিনো তৈরির সম্ভাবনা প্রায় ৬২ শতাংশ। এর ফলে দীর্ঘ ১৪০ বছরের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বের জলবায়ু ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে যেতে পারে। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে একদিকে চরম তাপদাহ, খরা, অন্যদিকে ভয়াবহ বন্যা এবং শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
আমাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এল নিনো তো প্রায়ই হয় থাকে, তাহলে এইবারেরটি নিয়ে এতো ভয় কেন?

স্বাভাবিক এল নিনো: সমুদ্রের উপরিভাগের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে হয়ে থাকে।
সুপার এল নিনো: পানির পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে কমপক্ষে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বৃদ্ধি পায়। ১৯৫০ সালের পর থেকে পৃথিবীতে এই মাত্রার উষ্ণায়ন খুবই কম দেখা গেছে।

২০২৬ সালের বৈশ্বিক জলবায়ুতে সুপার এল নিনোর ভয়াবহ প্রভাব:
মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের পাওয়া সব তথ্য ও পর্যবেক্ষণ মতে, একটি শক্তিশালী দুর্যোগপূর্ণ বছরের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে (২০২৬-২০২৭)। এর সম্ভাব্য প্রভাবগুলো হলো:

•রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা: আগামী বছরগুলোতে বিশ্বের তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
•ভয়াবহ খরা ও তাপদাহ: দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী খরা ও তীব্র তাপদাহ দেখা দেবে।
•বন্যা ও অতিবৃষ্টি: দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ বজ্রবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়বে।
•শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়: উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশে সুপার এল নিনোর প্রভাব:
সাধারণ এল নিনোর কারণে ১৯৯৭ সালের এল নিনোতে জুন মাসে বৃষ্টিপাত ৬০% কমে যায় এবং ২০২৩ সালে মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে ৬৭% কম হয়। তবে সুপার এল নিনো বাংলাদেশে আরো ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলবে, যেমন:
১. তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত।
২. খরা বা অতিবৃষ্টির কারণে কৃষিতে ক্ষতি।
৩. পানির সংকট ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি।
৪. স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি ও জনজীবনে দুর্ভোগ।

আমাদের কী করণীয়?
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে যে, স্থানীয় পূর্বাভাস ব্যবস্থা জোরদার করা, কৃষকদের সময়মতো সতর্ক করা, খরা ও তাপসহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং পানি ব্যবস্থাপনায় উদ্ভাবন — এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশসহ বিশ্বের উপর সুপার এল নিনোর ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top