বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে আমরা এখন অনেক এগিয়ে। সমুদ্রের তলদেশ থেকে শুরু করে মহাকাশ পর্যন্ত নানাবিধ আবিষ্কার, সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে আরো নতুন নতুন ব্যবহার উপযোগী ক্ষেত্র তৈরি করছি। আজ আমরা কথা বলবো জীবাশ্ম জ্বালানি (Fossil fuels) নিয়ে। এর প্রাথমিক ধারণা,কিভাবে আমরা পাচ্ছি,পরিমাণ,এর ব্যবহারে আমরা কতটুকু সতর্ক আছি,ব্যবহার পরবর্তী ঝুঁকি সম্বন্ধে আমাদের ধারণা কেমন তারই একটা ধারাবাহিক আলোচনা করবো।

 

জীবাশ্ম জ্বালানির কথা এলে প্রথমেই মাথায় আসে জীবাশ্ম আসলে কি এই প্রশ্নটি। জীবাশ্ম বলতে যেসকল প্রাণী বা উদ্ভিদ পাথরে পরিনত হয়েছে এরকম বস্তুকে বোঝায়।প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রাণী বা উদ্ভিদের ধ্বংসাবশেষ তথা মৃতদেহের চিহ্ন পাওয়া যায় ভূ-গর্ভ কিংবা ভূ-পৃষ্ঠের কঠিন স্তরে সংরক্ষিত পাললিক শিলা অথবা যৌগিক পদার্থে মিশ্রিত ও রুপান্তরিত অবস্থায়।অধিকাংশ জীবিত প্রাণীকুলেরই জীবাশ্ম সংগ্রহ করা হয়েছে।এছাড়াও অনেক প্রজাতিরই জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে যারা বর্তমানে পৃথিবীতে বিলুপ্ত।৩৪০ কোটি বছর থেকে দশ হাজার বছর পূর্বের তুষার যুগের প্রাণী ও উদ্ভিদদেহের ধ্বংসাবশেষ জীবাশ্মরূপে সংরক্ষিত আছে।

 

জীবাশ্ম জ্বালানি হলো এক প্রকার জ্বালানি যা বায়ুর অনুপস্থিতিতে অবাত পচন প্রক্রিয়ায় জীবাশ্ম থেকে তৈরি হয়।অর্থাৎ মৃত গাছের পাতা,মৃতদেহ ইত্যাদি জীবনের উপাদান হাজার হাজার বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে এ জ্বালানি তৈরি হয়।এ প্রক্রিয়ায় জ্বালানি তৈরি হতে মিলিয়ন বছর সময় লাগে, সাধারনত ৬৫০ মিলিয়ন বছর সময় লাগে।জীবাশ্ম জ্বালানিতে উচ্চ পরিমাণে কার্বন থাকে।কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস,খনিজ তেল ইত্যাদি জীবাশ্ম জ্বালানি।এসব জীবাশ্ম জ্বালানি পৃথিবীর সকল জায়গায় পাওয়া যায় না।যে দেশে পাওয়া যায় তার উপর অন্যান্য দেশ নির্ভর করে।    

 

এখন আমাদের মনে হতে পারে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা কি।আমাদের নিত্যদিনের ব্যবহার্য সামগ্রীর বেশিরভাগ জিনিসেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার রয়েছে।

 

তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান উপাদান কয়লা।কয়লা পুড়িয়ে সরাসরি তাপ পাওয়া যায় এটি একটি অতি পরিচিত জ্বালানি।কয়লা থেকে অনেক প্রয়োজনীয় উপাদান পাওয়া যায়।এদের মধ্যে রয়েছে কোলগ্যাস, আলকাতরা,বেনজিন,অ্যামোনিয়া,টলুয়িন।রান্না করতে ও বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালাতে ব্যবহৃত হয় কয়লা।একসময় জল পরিশোধনের জন্য ব্যবহৃত হতো কয়লা।

 

প্রাকৃতিক গ্যাস একসময় একটি অপ্রয়োজনীয় পদার্থ হিসেবে চিহ্নিত হতো যা পেট্রোলিয়ামের সাথে উৎপাদিত হতো।তবে বর্তমানে এটি একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদার্থ।এর প্রধান ব্যবহার জ্বালানি হিসেবে।তবে সিলিন্ডারে করে যে গ্যাস সরবরাহ করা হয় তা প্রধানত বিউটেন।অনেক সার কারখানায় ও তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রেও এর ব্যবহার রয়েছে।

 

শক্তির অন্যতম পরিচিত উৎস খনিজ তেল বা পেট্রোলিয়াম।পেট্রোলিয়াম থেকে নিষ্কাশিত তেল পেট্রোল।পাকা রাস্তার উপরে দেওয়া পিচ্, কেরোসিন ও চাষবাসের জন্য এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। তবে প্রধান ব্যবহার জ্বালানি হিসেবে।পেট্রোলিয়াম থেকে আরো পাওয়া যায় নানানরকম প্রসাধনী সামগ্রী যেমনঃ ক্যাশমিলন,পলিয়েস্টার,টেরিলিন ইত্যাদি।উনবিংশ শতাব্দী থেকে খনিজ তেলের বানিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় এবং তা ব্যবহৃত হয় তিমি মাছের তেলের পরিবর্তে। 

 

২০০২ সাল পর্যন্ত কয়লা,খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ছিল প্রায় (৩৪.৯+২৩.৫+২১.২) মিলিয়ন টন।

 

২০০৫-২০০৬ সাল পর্যন্ত এদের পরিমাণ নিম্নবর্ণিত-

 

কয়লাঃ ৯০৫ বিলিয়ন মেট্রিক টন(১৪৮ বছর চলবে), প্রাকৃতিক গ্যাসঃ ৬১৮৩-৬৩৮১ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট(৪৩ বছর চলবে), খনিজ তেলঃ১১১৯ বিলিয়ন ব্যারেল থেকে ১৩১৭ বিলিয়ন ব্যারেল(৬১ বছর চলবে)।

 

এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা জানলাম জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও এদের প্রয়োজনীয়তার কথা।পরিবেশের উপর এদের প্রভাব জানা আমাদের অত্যাবশ্যক।তবেই আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারে ঝুঁকি কমিয়ে সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি।

 

শিল্পবিপ্লবের পর গত ৪০০,০০০ বছরে কার্বন ডাই অক্সাইড(CO2) ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারে পরিবেশ দূষণ খুব বেশি ঘটে।একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে কয়লা থেকে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তড়িৎ আহরণে কর্মীদের মৃত্যুর হার পারমানবিক রিয়্যাক্টরে কর্মীর মৃত্যুর হারের সমান।

 

গাড়ি,এরোপ্লেন,জাহাজ,ট্রেন চালাতে যে জ্বালানি ব্যবহৃত হয় তা প্রধানত জীবাশ্ম জ্বালানি।মোটরগাড়ি ও কলকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া পরিবেশ দূষণ করে।কার্বন ডাই অক্সাইড আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়ে যাওয়ার দরুন সেসকল এলাকার জীববৈচিত্র্যের উপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলে।                                                                           

 

কার্বন নিঃসরণ শুন্যে নামানো কঠিন।প্যারিস চুক্তিতে ২০৫০ সালের মধ্যে পুরো বিশ্বের কার্বন নিঃসরণ শুন্যের কোটায় নামিয়ে আনার(নেট জিরো) কথা বলা হয়েছে।১৯৯৭ সালে করা বহুরাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক চুক্তি কিয়োটাে প্রোটকলে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমান কমানোর অঙ্গীকার করেছিলো।কার্বন নিঃসরণের পরিমানের উপর নির্ভর করে তৈরি ওই চুক্তি অধিকাংশ রাষ্ট্রই পালন করে নি।পরবর্তীতে ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে “ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশান” এর নামে সে বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে নেওয়া হয়।প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৪৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে।এ পদক্ষেপের সফলতা অর্জনের সম্ভাবনা খুব কম।এ পরিস্থিতিতে নতুন পদ্ধতি অবলম্বন না করলে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শুন্যে নামানো সম্ভব হবে না।

সামিয়া রহমান

ডিপার্টমেন্টঃ এপ্লাইড ম্যাথম্যাটিকস

ক্লাব পজিশনঃ মেম্বার