
পরমাণুর ভেতরেই নতুন ঘড়ি, নিউক্লিয়ার ঘড়ির হাত ধরে সময় মাপার নতুন যুগ!
সময় মাপার ইতিহাসে মানুষ সূর্যের ছায়া থেকে শুরু করে দোলক, কোয়ার্টজ ঘড়ি এবং পারমাণবিক ঘড়ি পর্যন্ত এসেছে। এবার সেই যাত্রা আরও গভীরে পৌঁছেছে—পরমাণুর কেন্দ্র, অর্থাৎ নিউক্লিয়াসে। ২০২৬ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এমন নিউক্লিয়ার ঘড়ি তৈরি ও পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছেন, যেখানে সময়ের ‘টিক’ তৈরি হচ্ছে ইলেকট্রনের নয়, পরমাণুর নিউক্লিয়াসের শক্তিস্তর পরিবর্তন থেকে। ইউরোপ ও চীনের দুটি গবেষক দল স্বাধীনভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি দেখিয়েছে। ইউরোপীয় দলের ঘড়িটি টানা ২৪ ঘণ্টা পরিচালিত হয়েছে।
প্রচলিত পারমাণবিক ঘড়িতে নির্দিষ্ট পরমাণুর ইলেকট্রন এক শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরে যাওয়ার সময় যে নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের আলো শোষণ বা নির্গত করে, সেটিই সময়ের অত্যন্ত নির্ভুল মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিউক্লিয়ার ঘড়ির ধারণাটি একটু আলাদা। এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে Thorium-229-এর নিউক্লিয়াসের একটি বিশেষ শক্তিস্তর পরিবর্তন। এই আইসোটোপটি বিশেষ, কারণ এর নিউক্লিয়ার ট্রানজিশনের শক্তি এত কম যে সেটিকে অতিবেগুনি বা vacuum-ultraviolet (VUV) লেজার দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা Thorium-229-কে calcium fluoride স্ফটিকের মধ্যে স্থাপন করে লেজারের কম্পাঙ্ককে নিউক্লিয়ার ট্রানজিশনের সঙ্গে মিলিয়ে স্থির রাখেন। একটি feedback system ক্রমাগত লেজারের কম্পাঙ্কের সামান্য বিচ্যুতি শনাক্ত করে সেটিকে সংশোধন করে। এভাবেই নিউক্লিয়াস নিজেই ঘড়ির ‘রেফারেন্স’ হিসেবে কাজ করে।
নিউক্লিয়ার ঘড়ি নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বড় কারণ হলো নিউক্লিয়াস ইলেকট্রনের তুলনায় বাইরের পরিবেশের অনেক প্রভাব থেকে বেশি সুরক্ষিত। ফলে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও স্থিতিশীল ও নির্ভুল সময়-পরিমাপের সুযোগ দিতে পারে। তবে বর্তমান প্রোটোটাইপগুলো এখনো বিশ্বের সেরা optical atomic clocks-এর নির্ভুলতাকে ছাড়িয়ে যায়নি। বরং এগুলো সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এর সম্ভাব্য ব্যবহারও অত্যন্ত বিস্তৃত। আরও উন্নত হলে নিউক্লিয়ার ঘড়ি নেভিগেশন, টেলিযোগাযোগ, স্যাটেলাইট-ভিত্তিক প্রযুক্তি এবং উচ্চ-নির্ভুলতার বৈজ্ঞানিক পরিমাপে কাজে লাগতে পারে। তবে এর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর সম্ভাবনা হয়তো মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানে। নিউক্লিয়ার ঘড়ির অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিমাপ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা অতি হালকা dark matter, মৌলিক ধ্রুবকের পরিবর্তন এবং Standard Model-এর বাইরের নতুন পদার্থবিজ্ঞানের সম্ভাব্য সংকেত খুঁজতে পারেন। ২০২৬ সালের ইউরোপীয় দল ইতিমধ্যেই তাদের ঘড়ির ডেটা ব্যবহার করে ultralight dark matter-এর সম্ভাব্য প্রভাব অনুসন্ধান করেছে।
অর্থাৎ, এই ঘড়ি শুধু সময় আরও ভালোভাবে মাপার যন্ত্র নয়। এটি ভবিষ্যতে মহাবিশ্বের এমন কিছু রহস্য অনুসন্ধানের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, যেগুলো বর্তমান প্রযুক্তিতে প্রায় অদৃশ্য। দুই দশকেরও বেশি সময়ের গবেষণার পর নিউক্লিয়ার ঘড়ি এখন কল্পনা থেকে বাস্তব পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিতে পৌঁছেছে—যদিও এর সবচেয়ে নির্ভুল ও ব্যবহারযোগ্য সংস্করণ তৈরি করতে এখনও অনেক পথ বাকি।
লিখেছেন
মোসামৎ সুমাইয়া আক্তার
যুগ্ম শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সায়েন্স ক্লাব।
