RUSC

অন্ধকারের সমাধান কি পরমাণুর কেন্দ্রেই?

গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা গরম। হঠাৎ পরিচিত পাখার সেই ভোঁ ভোঁ শব্দের নিস্তব্ধতা যা জানান দিয়ে যায় লোডশেডিংয়ের আগমনী বার্তা। অসহ্য গরমে অতিষ্ট হয়ে ভাবনার সাগরে ডুব দিয়ে সমাধানের সূক্ষ্ম আলোক রেখায় চোখে চিত্রায়িত হয় সম্ভাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-পারবে কি আমাদের সমস্যার সমাধানের পাথেয় হতে?

গাঠনিক রূপ,নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভিত্তি

‘পারমাণবিক চুল্লি’কথাটিই যেন মনে করিয়ে দেয় -সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিল (১৯৮৬), জাপানের ফুকুশিমা দাইচি বিপর্যয় (২০১১) এবং রাশিয়ার কিশটিম বিপর্যয় (১৯৫৭) – এর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। তবে রুপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টে (RNPP) ব্যবহৃত হয় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি কর্পোরেশন (Rosatom)-এর কারিগরি সহায়তায় ‘থার্ড জেনারেশন প্লাস'(III+) প্রযুক্তির ভিভিইআর-১২০০ (VVER-1200) মডেলের দুটি চুল্লি যার পাঁচ-স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ‘ডাবল কনটেইনমেন্ট বিল্ডিং’যেকোনো অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক (যেমন-বিমান হামলা বা ভূমিকম্প)দুর্ঘটনায় তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া থেকে দেয় সুরক্ষা (সোভিয়েত আমলের কিশটিমের সেকেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টের প্রযুক্তিগত বা কাঠামোগতভাবে ভিন্ন ও উন্নত)। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর মানদণ্ড অনুযায়ী এটি বিশ্বের অন্যতম পারমাণবিক নিরাপদ প্রযুক্তি। ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনা এড়াতে এতে রয়েছে ‘প্যাসিভ সেফটি সিস্টেম’, যা বিদ্যুৎ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিঅ্যাক্টর ঠান্ডা করে। এর অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা বলয় ‘কোর ক্যাচার’যা চুল্লি গলে যাওয়ার মতো চরম মুহূর্তেও তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়াতে দেয় না। বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও প্রকল্প সূত্রমতে,প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা (১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ের এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশই আসছে রাশিয়ান ফেডারেশনের ঋণ সহায়তা থেকে।

পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের নিপুণ কারসাজি

একটি ভারী অস্থিতিশীল পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে ভেঙ্গে পরিণত করা হয় একাধিক হালকা প্রায় সমান ভরের দুটি নিউক্লিয়াসে এবং বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হয় বিপুল তাপশক্তি –যা পরিচিত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’বিক্রিয়া নামে। এই চেইন বিক্রিয়ার মূল পক্রিয়াটিই রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌশল।

  • ফিশন বিক্রিয়া ও শক্তির জন্ম: রিঅ্যাক্টরের ভেতর তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম-২৩৫ ((_^235)”U” )পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে একটি ধীর গতির নিউট্রন দিয়ে আঘাত করা হলে তা ভেঙে বেরিয়াম ও ক্রিপ্টন তৈরি হয় এবং উৎপন্ন হয় ৩টি নতুন নিউট্রন এবং বিপুল পরিমাণ তাপশক্তি।

(_92^235)”U” +_0^1 “n” →_56^141 “Ba” +_36^92 “Kr”+3_0^1 “n”+200″ MeV”

আইনস্টাইনের ভর-শক্তি সমতুল্যতার সূত্রানুযায়ী, (E=Δmc^2)বিক্রিয়ার এই হারিয়ে যাওয়া ভরটুকু শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

  • তেজস্ক্রিয়তার হার ও ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশন: নিউক্লিয়াসের ক্ষয় বা ভাঙন হারকে প্রকাশ করা হয় প্রথম মাত্রার লিনিয়ার ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশন দ্বারা : dN/dt=-λN, যেখানে, N হলো নির্দিষ্ট সময়ে অক্ষত পরমাণুর সংখ্যা এবং λ হলো অবক্ষয় ধ্রুবক। এই সমীকরণের গাণিতিক মডেলিংয়ের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করা হয় চুল্লির তাপমাত্রা।
  • তাপ থেকে বিদ্যুৎ: ফিশন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপের ফলে প্রাইমারি লুপের পানি প্রচণ্ড চাপে ৩২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত হয়। এই পানি হিট এক্সচেঞ্জারের মাধ্যমে সেকেন্ডারি লুপের পানিকে ফুটিয়ে তৈরি করে উচ্চচাপের বাষ্প যা বিশাল টারবাইনকে ঘোরায়। টারবাইনের জেনারেটরের রোটর একটি সুষম চৌম্বক ক্ষেত্রের ভেতর ঘুরলে ফ্যারাডের তড়িতচৌম্বকীয় আবেশ নীতি অনুযায়ী উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ।

জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের অবদান: জ্বালানি কূটনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৬,০০০ মেগাওয়াট। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি (LNG) এবং কয়লার দামের অস্থিরতা ও দেশে ডলার সংকটের কারণে প্রকৃত উৎপাদন ১৩,০০০ থেকে ১৫,০০০ মেগাওয়াটের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

  • প্রতিবেশী নির্ভরতা বনাম কৌশলগত স্বকীয়তা: বর্তমানে ভারত থেকে প্রায় ২,৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর জ্বালানির জন্য অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৌশলগত দরকষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। রূপপুর একাই ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যা এই আমদানিনির্ভরতার শক্ত ভূ-রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করবে।
  • ডলার সংকট ও জ্বালানি কূটনীতি: বিশ্ববাজার থেকে কয়লা বা এলএনজি আমদানিতে খরচ হয় বিশাল বৈদেশিক মুদ্রা। অন্যদিকে,পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মাঝেও ‘রোসাটম’-এর সাথে চুক্তি অনুযায়ী রূপপুরের জ্বালানি দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ করা হবে। এটি এক অনন্য ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’, যা আমাদের বিদ্যুৎ খাতকে ডলারের আকস্মিক চাপ থেকে রক্ষা করবে।

লোডশেডিং মোকাবেলায় রূপপুরের পরিকল্পিত ব্যবহার ও গ্রিড ব্যবস্থাপনা

লোডশেডিংকে বিদায় জানাতে কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সুপরিকল্পিত গ্রিড ব্যবস্থাপন। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (PGCB) এবং ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাচ সেন্টার (NLDC)-এর সমন্বিত কাঠামোগত পরিকল্পনায় রূপপুরকে নিচের ধাপগুলোতে ব্যবহার করা হবে:

  • বেস-লোড ও পিক-শেভিং কৌশল: রূপপুরকে মূলত ব্যবহার করা হবে ‘বেস-লোড’ পাওয়ার প্লান্ট হিসেবে, যা দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা একনাগাড়ে বিদ্যুৎ দেবে। এটি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে বর্তমানে বেস-লোডে ব্যবহৃত দামি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে দিনের বেলা বন্ধ রাখা যাবে। পরবর্তীতে সন্ধ্যার ‘পিক-আওয়ারে’ (লোডশেডিংয়ের প্রধান সময়) যখন বিদ্যুতের চাহিদা হুট করে বেড়ে যাবে, তখন জমানো গ্যাস দিয়ে ওই কেন্দ্রগুলোকে শুধুমাত্র পিক-লোড সামলানোর জন্য চালু করা হবে।
  • সঞ্চালন লাইন ও আঞ্চলিক সুষম বণ্টন: উৎপাদিত বিদ্যুৎ ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে তৈরি করা হয়েছে ৪০০ কেভি (400 kV)হাই-ভোল্টেজ সঞ্চালন লাইনের বিশাল নেটওয়ার্ক। পদ্মা নদী পার হয়ে আমিনবাজার গ্রিড এবং দক্ষিণাঞ্চলের গোপালগঞ্জ গ্রিডের মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ সরাসরি রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে পৌঁছাবে, যেখানে বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
  • ধাপভিত্তিক লোডশেডিং নির্মূল: পরিকল্পনানুযায়ী প্রথম ধাপে ১২০০ মেগাওয়াট গ্রিডে যুক্ত হবে, যা তাৎক্ষণিকভাবে বড় শহরগুলোর লোডশেডিংয়ের তীব্রতা তলানিতে নামিয়ে আনবে। এরপর দ্বিতীয় ইউনিটের ১২০০ মেগাওয়াট যুক্ত হলে জাতীয় গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি এমন এক স্থিতিশীলতায় পৌঁছাবে, যেখানে সিস্টেম লস ব্যতীত লোডশেডিংয়ের প্রয়োজনই পড়বে না।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র – নিছক কোনো মেগা স্ট্রাকচার নয়, এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি স্থায়ী নোঙর। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বা ডলার সংকটে যখন সাধারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানির অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে, তখন রূপপুর বছরের পর বছর নিরবচ্ছিন্ন আলো দিয়ে যাবে। সুপরিকল্পিত গ্রিড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যখন আমাদের পিক-আওয়ারের ঘাটতি মেটাবে, তখন বর্তমানের লোডশেডিংয়ের বিশাল শূন্যস্থান একাই পূরণ হয়ে যাবে। পরমাণুর এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিভাজনই ভবিষ্যতে আমাদের গ্রীষ্মের ঘর্মাক্ত রাতের অন্ধকারকে চিরতরে তাড়িয়ে দেশকে নিরবচ্ছিন্ন আলোয় ভরিয়ে তুলবে।

লিখেছেন
শওকত আলী আবীর
অর্গানাইজার,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সায়েন্স ক্লাব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top