
মাঝে মাঝে কি আপনার মনে প্রশ্ন জাগে যে অ্যালার্ম ছাড়াই প্রতিদিন সকালে কীভাবে ঠিক নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়? কিংবা প্রতি রাতে একটা নির্দিষ্ট সময়েই কেন চোখে ঘুম নেমে আসে?
শরীরের ভেতরের এই নিখুঁত নিয়মানুবর্তিতা কোনো জাদু নয়৷ এটি আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক সময়নির্ধারক ব্যবস্থা যাকে বলা হয় বায়োলজিক্যাল ক্লক বা জৈবিক ঘড়ি (Biological Clock)।
দিন ও রাতের ২৪ ঘণ্টার আলো-অন্ধকারের চক্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই ঘড়ি শরীরের সব শারীরিক ও বিপাকীয় কাজ পরিচালনা করে। মানব মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে অবস্থিত সুপ্রাকায়াজমেটিক নিউক্লিয়াস (SCN) হলো শরীরের প্রধান বা মাস্টার ক্লক । এটি পরিবেশের আলোর সংকেত গ্রহণ করে শরীরের প্রতিটি কোষের ছোট ছোট পেরিফেরাল ঘড়িগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ২৪ ঘণ্টার এই আবর্তন চক্রকে সার্কাডিয়ান রিদম (Circadian Rhythm) বলা হয়।
বায়োলজিক্যাল ক্লক যেভাবে কাজ করে:
আমাদের অভ্যন্তরীণ ঘড়িটি মূলত তিনটি ধাপে কাজ সম্পন্ন করে:
১. আলোর সংকেত গ্রহণ: ভোরের আলো চোখের রেটিনায় থাকা আলোক-সংবেদনশীল কোষ শনাক্ত করে সরাসরি মস্তিষ্কের মাস্টার ক্লকে (SCN) সংকেত পাঠায়।
২. আণবিক ফিডব্যাক লুপ: শরীরের প্রতিটি কোষে থাকা ক্লক জিন (যেমন: CLOCK, BMAL1, PER, CRY) ২৪ ঘণ্টার একটি চক্রে প্রোটিন তৈরি ও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করার মাধ্যমে কোষের স্তরে সময় গণনা করে।
৩. হরমোন ও সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ: অন্ধকারের সংকেত পেয়ে মস্তিষ্ক মেলাটোনিন হরমোন নিঃসৃত করে যা আমাদের ঘুমাতে সাহায্য করে। আবার সকালের আলোতে মেলাটোনিন বন্ধ হয়ে কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ বাড়ে, যা আমাদের জাগিয়ে তোলে।
বায়োলজিক্যাল ক্লকের উপকারিতা:
সুস্থ দেহঘড়ি সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় হরমোন নিঃসরণ নিশ্চিত করে। রাতে ক্যানসার প্রতিরোধী শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট মেলাটোনিন তৈরি হয়ে গভীর ঘুম নিশ্চিত করে। দিনের বেলায় মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে শরীরকে কর্মক্ষম রাখে এবং অতিরিক্ত চর্বি জমতে বাধা দেয়। সবচেয়ে বড় কথা, এটি কোষের ক্ষয়প্রাপ্ত ডিএনএ মেরামত (DNA Repair) ও কোষ বিভাজন কঠোর শৃঙ্খলায় রাখে৷ ফলে ক্যানসার বা টিউমার সহজে দানা বাঁধতে পারে না।
ভেঙে পড়ার অপকারিতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি:
রাত জেগে মোবাইল-ল্যাপটপের কৃত্রিম নীল আলো ব্যবহার, অনিয়মিত খাবার অভ্যাস ও দীর্ঘস্থায়ী নাইট শিফটের কারণে এই জৈবিক ঘড়ি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (IARC) দীর্ঘমেয়াদি নাইট শিফটের কাজকে “সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান (Probable Carcinogen)” ঘোষণা করেছে। সার্কাডিয়ান রিদম ব্যাহত হলে ক্লক জিনগুলোর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন ঘটে, যা স্তন, প্রোস্টেট ও কোলোরেকটাল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ওবেসিটি, হৃদরোগ ও মানসিক অবসাদের জন্ম দেয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি:
গত কয়েক দশকে দ্রুত নগরায়নের ফলে বাংলাদেশে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে রাত জাগা ও অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস আমাদের দেহঘড়ি ওলটপালট করে দিচ্ছে। গার্মেন্টস, করপোরেট ও বিপিও (Call Center) সেক্টরে লাখ লাখ মানুষ নিয়মিত রাতের শিফটে কাজ করায় তাদের সার্কাডিয়ান রিদম ভেঙে পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে অপর্যাপ্ত ঘুম সরাসরি অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে৷ যা দেশের মোট রোগব্যাধির ৬১% (যেমন: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যানসার)। বর্তমানে দেশের প্রায় ১০% মানুষ ডায়াবেটিসে এবং ২৬.৪% মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। এছাড়া সাধারণ জনগণের ৪৫% এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ৫৮.৪% কোনো না কোনো ঘুমের সমস্যায় আক্রান্ত, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত (ক্রোনোথেরাপি) :
সার্কাডিয়ান রিদমের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ক্যানসার চিকিৎসায় যুক্ত হয়েছে এক বৈপ্লবিক পদ্ধতি হলো ক্রোনোথেরাপি। মানুষের সুস্থ কোষ ও ক্যানসার কোষের সক্রিয়তা দিনের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন থাকে। এই পদ্ধতিতে রোগীর অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি বিশ্লেষণ করে ঠিক এমন সময়ে কেমোথেরাপি বা ওষুধ দেওয়া হয়, যখন ক্যানসার কোষগুলো সবচেয়ে দুর্বল এবং সুস্থ কোষগুলো সবচেয়ে সুরক্ষিত থাকে। ফলে ওষুধের কার্যকারিতা বাড়ে এবং কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়।
References:
১. Malik, S. et al. (2021). Understanding the significance of Biological Clock and its impact on cancer incidence. Cancer Letters, 527, 80-94.
২. PubMed / PMC (NLM): Circadian rhythms and cancer: implications for timing in therapy (PMC11655929).
৩. WHO IARC: Shift Work and Cancer Risk Assessment.
৪. Frontiers in Immunology: Chrono-immunotherapy’s current and future optimization strategies (2026).
৫. Wikipedia
৬. The Daily Star: Sleep deprivation & NCDs in Bangladesh (Based on BRAC Research).
৭. IEDCR & BMJ Open: Sleep problems and associated risk factors in Bangladesh.
লিখেছেন,
নাদিম রহমান
অর্গানাইজার
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সায়েন্স ক্লাব
